ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মুর্তজা বশীরের ‘নন-ফিনিতো’ বা অসম্পূর্ণ

প্রকাশিত: ১৬ অগাস্ট ২০২১, রাত ৮ঃ৫৬

শিল্পী মুর্তজা বশীরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী (১৫ আগস্ট) এবং ৮৯তম জন্মবার্ষিকী (১৭ আগস্ট) সময়ের পার্থক্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর এমন ঘনিষ্ঠতা ইচ্ছাকৃত না হলেও শিল্পী বাঁচতে চেয়েছিলেন পাবলো পিকাসোর চেয়ে অন্তত এক দিন বেশি এই অসম্পূর্ণতার স্পর্শ জীবিতকালে তাঁকে সব সময় জাগিয়ে রাখত, ব্যস্ত রাখত সব সময় নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন, যা আগে কেউ করেনি

পাশাপাশি অসমাপ্ত কোনো কাজ ফেলেও রাখতেন না। খুঁতখুঁতে স্বভাবের পারফেকশনিস্ট ছিলেন। তারপরও থেকে যেত কিছু অসম্পূর্ণতা। সেটা ঘিরেই পরবর্তী ধ্যানে নতুন কিছু সৃষ্টি করতেন। শিল্পী মুর্তজা বশীরের তেমন এক অসম্পূর্ণ শিল্পকর্ম নিয়ে কিছু বলার আগে সামান্য ভূমিকা উল্লেখ করা সমীচীন মনে করি

কবি জন গ্রীনলিফ হুইটিয়ার ১৮৫৬ সালে এক ট্র্যাজিক কবিতা লেখেন নামমড মুলার মড একজন অত্যন্ত সুন্দরী নারী প্রথম দেখায় সে ভালোবেসে ফেলল শহরের এক বিচারককে সেই বিচারকও মডের সৌন্দর্যে বিমোহিত তবে তাঁরা কোনোভাবেই মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছিলেন না দুজন অন্য কাউকে বিয়ে করে পৃথক জীবন যাপন করতে থাকেন কিন্তু মোটেও ভুলতে পারছিলেন না তাঁদের অসম্পূর্ণ প্রেমের সেই প্রথম মুহূর্তকে

হুইটিয়ার এই ব্যর্থ প্রেমিক যুগলের মনের ভাব এককথায় কবিতায় লিখে গেছেন
ফর অফ অল স্যাড ওয়ার্ডস অফ টাং অর পেন
দ্য স্যাডেস্ট আর দিজ:
ইট মাইট হ্যাভ বিন!

কবিতাটি অসম্পূর্ণতা বা অপূর্ণতা প্রতিশব্দ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে। শিল্প-সাহিত্যে এই রকম দ্যোতনা উদাহরণ প্রচুর। তবে বিশেষ করে চিত্রকলায় কোনো কোনো শিল্পীর অসম্পূর্ণ কাজগুলোর আবহ দেখলে একই রকম হাহাকার অতৃপ্তি বোধের জন্ম হয়

কালের বিচারে দেখা যায় রকম অনেক কাজ পরিপূর্ণভাবে টিকে গেছে অনেক গুণী শিল্পীর অসম্পূর্ণ ক্যানভাস বা স্কেচের খাতা শিল্পমানে আজও আলোচিত হয়ে আসছে পরম আগ্রহে

রেনেসাঁ আমলের এশিয়ান, দা ভিঞ্চি, মাইকেলাঞ্জেলো থেকে শুরু করে ইম্প্রেশনিস্ট যুগের দেগা, সেজান, ক্লদ মনে প্রমুখের অনেক অর্ধ-সমাপ্ত, অসমাপ্ত কাজের নমুনা আমরা দেখতে পাই। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীদের স্বাক্ষর থাকত অনুপস্থিত সেই সব ক্যানভাসে। তাঁদের কাজের ধরন বিচার করে নির্ধারণ করতে হয়েছে কোনটা কার আঁকা অসমাপ্ত কাজ

ইতালিয়ান ভাষায় এই ঘরানার কাজকে বলা হয়নন ফিনিতো বিশেষ করে লেওনার্দো দা ভিঞ্চির ১৪৮০ সালে আঁকা অসম্পূর্ণ ক্যানভাসসেন্ট জেরোমে ইন দ্য ওয়াইল্ডারনেস’-এর কথা শিল্প রসিকেরা জেনে থাকবেন। ভিঞ্চির এমন আরও কিছু অসমাপ্ত কাজ খুঁজে পাওয়া গেছে, যা শিল্পের বিচারে অনন্য। তেমন আরেকটা উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে ১৪৮১ সালে আঁকাঅ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই অনেকের ধারণা ভিঞ্চি এই সব অসমাপ্ত কাজগুলোর মধ্যে ভিন্ন ধরনের রহস্য লুকিয়ে আছে। এমনকি বিখ্যাত মোনালিসা চিত্রকর্মও অসমাপ্ত ধারণা করা হয়

একইভাবে অসম্পূর্ণ কাজ পাওয়া গেছে মাইকেলাঞ্জেলোর ১৪৯০ সালে আঁকাম্যানচেস্টার ম্যাডোনানামের এক অনুপম শিল্পকর্ম, যা লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে আছে আরও পাওয়া গেছে ১৫৭০ সালে তিশিয়ানের আঁকাফ্লাইং অব মারসায়ানামের এক পৌরাণিক আবহের ছবি নন-ফিনিতো স্টাইলে তিশিয়ানের আরেক উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছেদ্য ডেথ অব অ্যাক্টিয়ন

ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানার শিল্পী পল সেজানের অনেক কাজ দেখে শিল্প রসিকদের মনে প্রশ্ন জাগে আসলে কাজটা কি পুরোপুরি শেষ করা হয়েছে? নাকি কিছুটা বাকি আছে। চোখে অতৃপ্তির ধাক্কা লাগে। সেজান অনেক ক্যানভাসের কিছু অংশ খালি রাখতেন। কারণ, শিল্পী আশঙ্কা করতেন যদি সামান্য অতিরিক্ত তুলির আঁচড়ে পুরো কাজটির আবহ নষ্ট হয়ে যায়? তাই সেজানেরটার্নিং রোডশিরোনামের ক্যানভাসটি প্রায় পুরোটাই অসম্পূর্ণ দেখতে পাই। একইভাবে পোর্ট্রেট শিল্পী গিলবার্ট স্টুয়ার্ট বিখ্যাত হয়ে আছেন ১৭৯৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের অসমাপ্ত প্রতিকৃতি এঁকে। শিল্পের ইতিহাসে এমন প্রচুর নমুনা আমরা খুঁজে পাব