ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

গর্ভবতীদের মৃত্যু বাড়ছে

প্রকাশিত: ১০ অগাস্ট ২০২১, বিকেল ৫ঃ৫৮

গর্ভবতীদের মৃত্যু বাড়ছে

চট্টগ্রামে গর্ভবতী নারীদের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ বয়ে আনছে করোনাভাইরাস। শেষ চেষ্টা হিসেবে গর্ভপাত করিয়েও মাকে বাঁচানো যাচ্ছে না। গত এক মাসের একাধিক ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, করোনার শুরুতে দুয়েকজন গর্ভবতী নারী পেটে বাচ্চা নিয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও প্রথম দফায় গর্ভবতী নারীদের করোনায় আক্রান্তের হার ছিল কম। 



তবে চলতি বছরের জুলাই থেকে শুরু হওয়া করোনার নতুন ঢেউয়ে অনেক গর্ভবতী নারী করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে রোগী বাঁচাতে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা রোগীদের অ্যাবরশন বা গর্ভপাত করিয়েও মাকে বাঁচানো প্রায়ই সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর বাসিন্দা সাইয়ারার (ছন্দনাম) পেটে যখন ছয় মাসের বাচ্চা, গত ২৪ জুলাই তার নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। অবস্থা একটু খারাপের দিকে এগোতে থাকলে ৩০ জুলাই তাকে ভর্তি করানো হয় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। ৩৫ বছর বয়সি এই গৃহিণীর শারীরিক অবস্থার দ্রুতই অবনতি হতে থাকলে ১ আগস্ট তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আইসিইউতে। কিন্তু সেখানে ক্রমেই তার অক্সিজেন লেভেল নিচে নেমে যাচ্ছিল। প্রথম দিন ২০ লিটার গতিতে অক্সিজেন দেওয়া হলেও চতুর্থ দিনেই সেটা উঠে যায় ৮০ লিটারে। 



ডাক্তাররা আগের অভিজ্ঞতা থেকে তখনই বুঝতে পারছিলেন, মা হতে যাওয়া এই নারীকে বাঁচানো কঠিন হবে। শেষ চেষ্টা হিসেবে বুধবার রাতে পেটের বাচ্চা বের করে নেওয়া বা অ্যাবরশনের চেষ্টা করলেন ডাক্তাররা। ৫ ঘণ্টার সেই চেষ্টা বিফল হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে আবার চলল অ্যাবরশনের চেষ্টা। সাইয়ারারকে সেদিন দেওয়া হচ্ছিল ৯০ লিটার গতির অক্সিজেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ওইদিন রাত ১২টার দিকে মারা যান তিনি।



অ্যাবরশন বা গর্ভপাত ঘটিয়ে করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী নারীকে বাঁচানোর চেষ্টা চট্টগ্রামে এটিই প্রথম নয়। কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালেও এমন একটি চেষ্টা করা হয়েছিল। খুবই ক্রিটিকাল অবস্থায় চলে যাওয়া রোগীকে বাঁচানোর সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে ৪ মাসের গর্ভবতী ওই নারীর বাচ্চা অ্যাবরশন করিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের গাইনি কনসালট্যান্ট ডা. রওশন আরা। তিনি বলেন, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা গর্ভবতী করোনা আক্রান্ত রোগী পেয়েছি সব মিলিয়ে ১০ণ্ড১২ জন। 



আর এই জুলাইয়ে প্রতিদিনই গড়ে আমরা দুজন করে রোগী ভর্তি করাচ্ছি। এদের বেশিরভাগেরই অক্সিজেন ও আইসিইউ প্রয়োজন হচ্ছে। অল্প সংখ্যক রোগী পাচ্ছি যাদের অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে আমরাও সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছি। প্রায় প্রতিদিনই সিজার হচ্ছে, নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে।



চট্টগ্রামের এই অন্যতম করোনা চিকিৎসাকেন্দ্রে করোনা ডেডিকেটেড গাইনি ওয়ার্ড রয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ১০ জন গর্ভবতী নারী। গত এক মাসে চট্টগ্রামের বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালেও মোট ১২ জন কোভিড আক্রান্ত গর্ভবতী নারী ভর্তি হয়েছেন। যাদের মধ্যে দুজন নারী গর্ভে সন্তান নিয়েই মারা গেছেন। একজন মারা গেছেন সিজারিয়ান অপারেশনের পর।



হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার তালুকদার জিয়াউর রহমান শরীফ বলেন, গর্ভবতীদের মধ্যে যারা ভর্তি হচ্ছেন সবারই উচ্চমাত্রার অক্সিজেন লাগছে। অনেকের ১০০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা আইসিইউ বেডেই ডেলিভারি সম্পন্ন করার একটা ফুল সেটআপ রেডি করেছি।



এবারে হঠাৎ এত পরিমাণ গর্ভবতী নারী আক্রান্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের করোনা চিকিৎসা কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. অলক নন্দী বলেন, গত কয়েকদিন আগ পর্যন্ত আমরা তরুণদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারিনি। এ ছাড়াও গর্ভবতীদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন আছে। সেখানেও অনেক ঘাটতি থেকে যায়।



নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একজন নামি চিকিৎসক বলেন, শেষ তিন মাসে যদি করোনা পজিটিভ হন কোনো গর্ভবতী মা, তখন তার জীবনের ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। কারণ স্বাভাবিক সময়ে যে ফুসফুসটা অক্সিজেন নেওয়ার জন্য প্রসারিত হয়, জরায়ু শেষ তিন মাসে বেশ বড় হয়ে যাওয়ার কারণে মাত্র তিন ভাগের প্রায় এক ভাগ ফুসফুস প্রসারিত হতে পারে।