ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং | ৫ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ঈমানদারের মানসিক প্রশান্তির রহস্য

প্রকাশিত: ১০ অগাস্ট ২০২১, সন্ধ্যা ৬ঃ৩৪

 

জীবনযাপনের জন্য মানসিক চাপ না রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও এটি আমাদের জীবনের ধ্রুব বাস্তবতা। মানুষের জীবনে বিচিত্র ধরনের উত্থানণ্ডপতন রয়েছে, রয়েছে অসংলগ্নতা, দুঃখণ্ডকষ্ট, অপ্রাপ্তি ও বেদনা। করোনাকালে এই বাস্তবতা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।



পরীক্ষায় অল্পের জন্য ফার্স্ট ক্লাস ছুটে গেছে, মাস্টার্সে না পেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে, ছেলে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, পাশের টেবিলের সহকর্মীর পদোন্নতি হয়ে গেল- ইত্যাদি হতাশা যেন আমাদের ঘিরে ধরে। কিন্তু এই বাস্তবতা নিয়েই পার্থিব জীবন। তবুও একটু প্রশান্তির খোঁজে মানুষ ছুটছে প্রতিনিয়ত। এই প্রশান্তি আসলে কোথায়? টাকাণ্ডপয়সায়? বাড়িণ্ডগাড়িতে? ক্ষমতায়? নাকি অন্য কিছুতে!

আমাদের শরীর খাঁচার মতো। মন হলো চিন্তার জায়গা আর মনকে তার জায়গায় ঠিক রাখাই আমাদের প্রশান্তির প্রথম কাজ। শরীর যেমন সুষম আহার ও সুনিদ্রায় সুস্থ থাকে, তেমনি সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা ও মহান প্রভুর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে আমাদের মন ও আত্মা প্রশান্ত হতে পারে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।

 

সেসব আলোচনার সারমর্ম হলো- যাদের অন্তর ঈমানের নূরে আলোকিত, তারা সমগ্র পৃথিবীতে সুন্দর, কল্যাণ আর ভালো ছাড়া অন্য কিছুই চোখে দেখেন না। তারা মহাপ্রজ্ঞাবান সেই স্রষ্টা ও প্রতিপালক খোদার প্রার্থনা করেন যিনি এই বিশ্বকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যণ্ডউদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি সুন্দর ও কল্যাণ ছাড়া তার সৃষ্টিকূলের জন্য অন্য কোনো কিছুই পছন্দ করেন না। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো কিছুতে ঘাটতি থাকে কিংবা জটিলতা থাকে, তা হলে সেসব অসঙ্গতি সহনীয় এবং সমাধানের পর্যায়ে পড়ে। এসব উপলব্ধির মাধ্যমে ঈমানদারের অন্তরণ্ডআত্মা প্রশান্ত হতে পারে।

 

মানুষ যখন মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়, তখন এক ধরনের নেতিবাচকতা তাকে পেয়ে বসে। নিজের সম্পর্কে বা নিজের দিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করে। ফলে আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে ওঠে, বিষণ্নতা অবসাদ পেয়ে বসে। এমন অনাকাক্সিক্ষত মানসিক অবস্থার কুপ্রভাব ব্যক্তি আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে সে অশালীন ও অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করে, অযথা উত্তেজিত হয়ে যায়।

 

 

 

একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, মুসলিমরা এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী। কারণ মুসলিমরা একজন সৃষ্টিকর্তার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে জীবন পরিচালনা করেন। মুসলিমরা তাকদির বা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন। ফলে অল্পতেই তারা সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তি বোধ করেন। মুসলিমদের মনে আল্লাহর ভয় থাকে বদ্ধমূল। ফলে তারা বহুবিধ পাপাচার থেকে বিরত থাকেন। আল্লাহর একত্ববাদ আর আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস মুসলিমদেরকে প্রভাবিত করায় হতাশা ও উদ্বেগ তাদেরকে খুব বেশি গ্রাস করতে পারে না। গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতি মাত্রায় একত্ববাদে বিশ্বাস বিষণœতা, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও আত্মহত্যার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে, ধর্ম ও সুখের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সংযোগ আছে। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই ১৯)

 

ইতালির বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ৩৮ বছর বয়স্ক রোকসানা ইলিনা নেগ্রা ইসলাম গ্রহণের পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন করেছি। যতই পড়েছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। এই মুগ্ধতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্র। আমি সবসময় প্রশান্তির জন্য, অসুস্থতা থেকে নিরাময়ের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা ও গবেষণা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ! আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি- ইসলামেই রয়েছে সব কিছুর সঠিক সমাধান। (সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব, ১৬ জানুয়ারি ২০১৭)

 

 

 

ইসলামের প্রধান ইবাদত নামাজ অনুশীলন দুনিয়াতে প্রশান্তি লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম। (প্রাগুক্ত)। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আসে। নামাজ আদায়কারীরা মানসিক অশান্তি থেকে নিরাপদ থাকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে ভীরুরূপে। যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হাণ্ডহুতাশ করে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়। তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামাজ আদায়কারী। যারা তাদের নামাজে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে। (সুরা মায়ারিজ : আয়াত ১৮ণ্ড২৩)

 

পরিপূর্ণ মানসিক প্রশান্তি লাভ ও সবরকম মানসিক উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করা। আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি এবং হৃদয়ের পরিতৃপ্তি অর্জিত হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, যারা ঈমান আনে ও আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই শুধু হৃদয় প্রশান্ত হয়। (সুরা রাদ : আয়াত ২৮)

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেন, বেলাল (রা) কে বলতেন, নামাজের ইকামত দাও, এর মাধ্যমে আমাকে প্রশান্তি দাও। (আবু দাউদ : ৪৯৮৫)। তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন পেরেশান হতেন নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। (আবু দাউদ : ১৩১৯)। একজন ঈমানদার আল্লাহ তায়ালার ওপর এই বিশ্বাস রাখে যে, সর্ববিষয়ে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। (সুরা তালাক : আয়াত ৩)। আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা ও পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস স্থাপনে তার মনোবল বেড়ে যায়। ফলে প্রকৃত মুসলিমরা অন্তরে অনুভব করে এক অনাবিল প্রশান্তি ও তৃপ্তি।